DESH DESK:
সুন্দরবনে মানুষ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংঘাত ঠেকাতে ৭৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নাইলনের জাল দিয়ে তৈরি বিশেষ বেড়া নির্মাণ করেছে বন বিভাগ। বনের ভেতরে মাছ, কাঁকড়া, মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতে যাওয়া বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের দাবি, নাইলনের এই বেড়া স্থাপনের ফলে বাঘের সঙ্গে মানুষের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমেছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে ৪৪ কিলোমিটার এবং পশ্চিম বিভাগে ৩০ কিলোমিটার বেড়া রয়েছে। ধানসাগর, কৈখালী ও কৈলাশগঞ্জের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এসব বেড়া স্থাপন করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “সুন্দরবনে মৌয়াল, বাওয়ালি, জেলে-কাঁকড়াশিকারিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে প্রবেশ করেন। এ সময় বাঘসহ বিভিন্ন হিংস্র বন্যপ্রাণীর আক্রমণের আশঙ্কা থাকে। এসব আক্রমণ প্রতিরোধ এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মূলত নাইলনের বেড়া ব্যবহার করা হচ্ছে।”
তিনি জানান, সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশের কথা বিবেচনায় রেখে তুলনামূলক হালকা, টেকসই এবং সহজে স্থাপনযোগ্য এই বেড়া ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এটি খুলে অন্য স্থানেও স্থাপন করা সম্ভব।
সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার মানুষ মাছ, কাঁকড়া, মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ কারণে তাঁদের নিয়মিত বাঘের বিচরণক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হয়। এতে মানুষ ও বাঘের মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, নাইলনের বেড়া বাঘের সামনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বাধা হিসেবে কাজ করে। বেড়া দেখতে পেয়ে বাঘ অনেক ক্ষেত্রে পথ পরিবর্তন করে বনের ভেতরে ফিরে যায়। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক দীপন চন্দ্র দাস বলেন, গত চার-পাঁচ বছরে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা আরও জানান, ২০১৮ সালে সর্বশেষ লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। এরপর এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি বলে তাঁদের দাবি। তবে সংঘাত কমার পেছনে বেড়ার ভূমিকা কতটা, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুন্দরবনে মানুষ ও বাঘের সংঘাত দীর্ঘদিনের সমস্যা। বনের ভেতরে অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান, রান্না করা, খাবার সংরক্ষণ এবং বনের সীমানার কাছাকাছি রাতযাপনের কারণে বনজীবীরা ঝুঁকির মুখে পড়েন। এসব স্থানে বেড়া স্থাপন করলে মানুষ ও বাঘের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
উল্লেখ্য, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে প্রায় ২০০০ সাল থেকে ২০ বছরের ব্যবধানে মানুষ ও বাঘের সংঘাতে আনুমানিক ৩০০ জন মানুষ এবং ৩৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে মানুষের ওপর বাঘের আক্রমণ ও সংঘাতের ১৭২ থেকে ৩২৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে।
তবে পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, নাইলনের বেড়াকে সংঘাত প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বেড়া এমনভাবে স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, যাতে বাঘসহ অন্য কোনো বন্যপ্রাণী আটকে গিয়ে আহত না হয় এবং তাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত না হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাইলনের বেড়ার পাশাপাশি বনজীবীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদে বনে প্রবেশের নিয়ম অনুসরণ, আগাম সতর্কবার্তা, নিয়মিত বন টহল এবং বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপের এ সময়ে বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণও জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা মূল্যায়নের মাধ্যমে নাইলনের এই বেড়া সুন্দরবনে মানুষ ও বাঘের নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন